শিক্ষার্থী না পাওয়ায় বন্ধ হয়ে যাচ্ছে ব্র্যাক স্কুল

১৯৭২ সালে ব্র্যাক প্রতিষ্ঠার পর থেকেই বিভিন্ন সামাজিক উন্নয়ন মূলক কর্মকান্ডে ভুমিকা রেখে এসেছে ব্র্যাক প্রতিষ্ঠান। তবে বর্তমানে এই অলাভজনক প্রতিষ্ঠানটির একটি অংশ, ব্র্যাক প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষা দিন দিন হারিয়ে যাচ্ছে। সরকারি স্কুলে বিনামূল্যে বই বিতরন ও নিয়মিত স্কুলে উপস্থিত হলে বৃত্তি প্রদান। এছাড়াও ব্র্যাক স্কুলে অনুদানের পরিমান কমে যাওয়ার কারনে শিক্ষার্থীদের উপর বাড়তি আর্থিক চাপ পড়ায় অভিভাবকগন সরকারি স্কুলের উপর গুরুত্ব দিচ্ছেন।

১৯৯৫ সাল থেকে পাঁচশত পঁচিশ টাকা বেতনে শিক্ষকতা করেন আসছেন রুমেলা। তিনি বলেন চাকরির প্রথম দিকে ব্র্যাক শিক্ষার উপকরন এবং যাবতীয় খরচ বহন করতো এই প্রতিষ্ঠানটি, তবে ২০১৬ সালে ব্র্যাক শিক্ষার উপর থেকে বিদেশী সহায়তা কমে যাওয়ায় শিক্ষার্থী প্রতি ১০০ টাকা করে নেওয়া হতো। ২০১৯ সালের জানুয়ারি মাস থেকে সে টাকা নেওয়া বন্ধ করার নির্দেশ আসে। এরই মাঝে বন্ধ হয়ে যায় অনেক ব্র্যাক স্কুল।

বর্তমানে একজন ব্র্যাক শিক্ষক প্রথম শ্রেণীর শিক্ষার্থীদের পড়ানোর জন্য বেতন পায় ২৫০০ টাকা এবং প্রতি বছর সামান্য কিছু টাকা বৃদ্ধি পায়। পঞ্চম শ্রেণি পাশ করার পর যখন আবার প্রথম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের পড়ানো শুরু করা হয় তখন শিক্ষকের বেতন আবার ২৫০০ টাকা হয়ে যায়।

ব্র্যাক প্রাক-প্রাথমিক বিদ্যালয়ে একজন মাত্র শিক্ষক একটি ঘরের মধ্যে প্রথম শ্রেণি থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত পাঠদান করে থাকেন। এখানে প্রথম থেকে তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থীদের ব্র্যাকের নিজেস্ব পুস্তক দ্বারা পাঠদান কার্যক্রম চালানো হয়। তবে চতুর্থ ও পঞ্চম শ্রেণিতে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পাঠ্যপুস্তক দ্বারা পড়ানো হয়।

ব্র্যাকের যে পাঠ্যপুস্তক তাতে পড়াশোনাকে ছবির মাধ্যমে সহজভাবে বোঝানো হয়ে থাকে। এছাড়াও একটি ব্র্যাক স্কুলে শিক্ষার্থীদের নিজ নিজ অঙ্কিত চিত্র দেওয়ালে লাগিয়ে সৌন্দর্য্য বৃদ্ধি করাও হয়ে থাকে। এ স্কুলে কোন ব্রেঞ্চ থাকেনা তাই মাটির উপর খেজুর পাতার পাটি বিছিয়ে বসার জায়গা করা হয়।

শিক্ষা উপকরনের মধ্যে এখানে লিখার জন্য স্লেট, চক, রঙ পেন্সিল, খাতা, অংকের সমাধান করার জন্য বিভিন্ন হাতে বানানো কাঠি, ছবি যুক্ত বই সহ অনেক উপকরন দেওয়া হয়।

শিক্ষক এখানে অতি যত্নের সাথে শিক্ষাদান করে থাকেন তাই  এখানকার শিক্ষার্থীদের আলাদাভাবে প্রাইভেট পড়তে হয় না। সাধারনভাবে এই স্কুলে তিন ঘন্টা পড়ানোর নিয়ম তবে শিক্ষকগণ আরো এক ঘন্টা শিক্ষার্থীদের অতিরিক্ত পাঠদান করে থাকেন। কারোর হাতে লিখা খারাপ হলে, কারোর কোন কিছু বুঝতে সমস্যা হলে সে এক ঘন্টায় সমস্ত বিষয়গুলো সমাধান করা হয়। এখানে পাশের হারও বেশি এবং অধিকাংশ সময় ব্র্যাক থেকেও পঞ্চম শ্রেণিতে বেশকিছু বৃত্তিও পেয়ে থাকে।

বিভিন্ন কারনেই দিন দিন শিক্ষার্থীদের আগ্রহ কমে যাচ্ছে ব্র্যাক স্কুলের প্রতি ফলে সমস্যায় পড়ছে হতদরিদ্র পরিবারের শিশুগুলো। পর্যাপ্ত পরিমান শিক্ষার্থী না পাওয়ায় উঠে যাচ্ছে ব্র্যাক স্কুলগুলো তাই গ্রামের হতদরিদ্র পরিবারের শিক্ষার্থীরা প্রাথমিক শিক্ষা থেকে ছিটকে যাচ্ছে। এর ফলে হয়তো ঝরে যাবে গ্রামের হাজার হাজার দরিদ্র পরিবারের শিশু। এই পরিস্থিতি শিথিল করার জন্য ব্র্যাককে অবশ্যই বিনামূল্যে শিক্ষাদান কার্যক্রম চালিয়ে যেতে হবে, এবং গ্রামে গ্রামে নতুনভাবে ব্র্যাক স্কুল প্রতিষ্ঠা করতে হবে ।

এই বিষয়ে রুমেলা যা বললেন আমাদের।

প্রশ্নঃ আপনি কতদিন থেকে ব্র্যাক স্কুলের শিক্ষকতা করছেন?
রুমেলাঃ ১৯৯৫ সাল থেকে আমি ব্র্যাকের সাথে আছি।

প্রশ্নঃ শুরুর দিকে আপনার বেতন কত টাকা ছিল?
রুমেলাঃ আমি পাঁচশত পঁচিশ টাকা বেতনে কাজ শুরু করি।

প্রশ্নঃ আপনার শিক্ষাগত যোগ্যতা?
রুমেলাঃ আমি এইচ এসসি পাস।

প্রশ্নঃ অন্য কোথাও চাকরি করলেন না কেন?
রুমেলাঃ চেষ্টা করেছিলাম।

প্রশ্নঃ আপনার যে বেতন তাতে কি সংসার চলে?
রুমেলাঃ এই বেতনে কি হতে পারে বলেন তবে যা আসে সংসারে তাই অনেক।

প্রশ্নঃ আপনার এখানে কেমন পরিবারের ছাত্র ছাত্রী আসে?
রুমেলাঃ দরিদ্র পরিবারের বেশি আসে। কারোর বাবা কৃষক তো কারোর বাবা ভ্যান চালক।

প্রশ্নঃ এসব পরিবারের শিশুদের পড়াতে আপনার সমস্যা হয় না?
রুমেলাঃ আমি তিন ঘন্টা পড়ানোর পর অতিরিক্ত এক ঘন্টা এদের পড়া বুঝিয়ে দেই। তাছাড়া ক্লাসের পড়া ক্লাসেই শেষ করিয়ে নেই বাসায় বই নিয়ে যেতে দেই না কারন এরা বাসায় পড়াশোনা করে না।

প্রশ্নঃ আপনার বেতন বৃদ্ধি হলে কোন কোন সুবিধা আপনি দিতে পারতেন?
রুমেলাঃ বেতন বেশি হলে আমি আরো বেশি গুরুত্ব দিতে পারতাম।

প্রশ্নঃ আপনাদের জন্য কি কোন ট্রেনিং এর ব্যবস্থা থাকে?
রুমেলাঃ জি। আমাদের জন্য ট্রেনিং এর ব্যবস্থা থাকে এবং আমরা সেভাবে পড়ায়।

প্রশ্নঃ শিক্ষক হিসেবে আপনি কতটুকু সফল মনে করেন?
রুমেলাঃ আমার শিক্ষকতা জীবনে আমি অনেকটায় সফল কারন আমি যাদের প্রথম শ্রেণি থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত পড়ায় তারা সবাই ভালো ফলাফল নিয়ে বের হয় তাছাড়া প্রতি গ্রুপ থেকে পিএসসি পরিক্ষায় জিপিএ ৫ ও বৃত্তি পেয়েই থাকে। তাই আমি নিজেকে সফল শিক্ষক বলে মনে করি।

প্রশ্নঃ এ পেশায় সমস্যা কি কি?
রুমেলাঃ বিদেশী অনুদান না পাওয়ার জন্য ব্র্যাকের শিক্ষার্থীদের থেকে কাছ থেকে টাকা নেওয়া শুরু হয় ২০১৬ সাল থেকে এই সমস্যার জন্য অধিকাংশ স্কুল বন্ধ হয়ে যায়। এটিই আমার কাছে মূল সমস্যা মনে হয়েছে।

প্রশ্নঃ ভবিষ্যতে কি এই ব্র্যাক শিক্ষার প্রয়োজন হবে?
রুমেলাঃ আমরা যদি সঠিকভাবে শিক্ষাদান করতে পারি তাহলে অবশ্যই ব্র্যাক শিক্ষার প্রয়োজন থাকবে। তবে সরকারি স্কুলগুলোর সামনে আমরা এখন কিছুই না। সেখানে প্রত্যেকটি শিক্ষার্থীর জন্য বৃত্তির ব্যবস্থা করা করা হয়েছে তাই যে এলাকায় সরকারি স্কুল আছে সেখানে ব্র্যাকের জন্য ছাত্র ছাত্রী পাওয়া কঠিন হয়ে যাচ্ছে।

ধন্যবাদ আপনাকে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *