শিশু শ্রমিক

ছবিতে যে বাচ্চা কে দেখা যাচ্ছে তাকে আমি পাঁচ বছর ধরে অনুসরণ করি। তার পড়াশোনা, তার পরিবার, তার ইচ্ছে, তার বন্ধু সবকিছুই আমি দেখতাম। আর এর মধ্য দিয়ে আমি শিশু শ্রম ও বাচ্চাদের ঝরে পড়ার বিষয়গুলো কিছুটা হলেও বুঝতে পেরেছি।

ওর নাম তাপস বর্তমানে তার বয়স ১৩ বছর। পড়াশোনা জানে না, তবে টাকার হিসাবটা সে রাখতে পারে এমনটায় তার কাছে শোনা। প্রথম শ্রেণী পর্যন্ত পড়াশোনা করেছে সে, তারপর আর পড়তে ভাল লাগেনি তাই তার বাবা তাকে কাজে লাগিয়ে দেয়।

যে এলাকায় তাপস থাকে সেখানকার সবাই খেটে খাওয়া মানুষ। কেউ মাছ ধরার কাজ করে তো কেউ হাতের কাজ করে। জন্মের পর থেকেই এমনটা দেখেছে সে তাই হয়তো তার মধ্যে পড়াশোনার ইচ্ছে টা বাসা বাধতে পারেনি।

তাপসের বাবা একজন দিন মজুর। মাছ ধরে যা টাকা পায় তা দিয়ে পরিবারের খরচ চালায়। পাঁচ জন সদস্যের পরিবারে এই অর্থ যেনো কিছুই না পরিবার সামলাতে হিমসিম খেতে হয় তাপসের বাবাকে। তাপসদের পরিবারে তারা তিন ভাই ও বাবা মা থাকেন।

একে তো পরিবারে অভাব, তার উপর তাপস পড়াশোনা করতে চায় না। পরিবারের ইচ্ছে ছিল যতটুকু পারবে তাকে পড়াবে, কিন্তু প্রথম শ্রেণী পার করতে না করতেই পড়াশোনা করার ইচ্ছে হারিয়ে ফেলে তাপস। শুধু তাপসই না তার এলাকার যত বাচ্চা আছে কেউ ই প্রাইমারি স্কুলের বাইরে পড়াশোনা করেনি। তাই যে যখন পড়ার ইচ্ছে হারিয়েছে তাকে তখনই কাজে লাগিয়ে দেওয়া হয়েছে।

এই বয়সে যদি একটি বাচ্চা স্কুলে না যায় তাহলে তার ভবিষ্যত খারাপ হবে এবং সে কোন না কোন খারাপ কাজে জড়িয়ে পড়বে। এরা কাজ করলে সংসার চলবে, দু বেলা পরিবারের সবাই ভাত খেতে পাবে এই ভেবেই পরিবার থেকে কাজে দিয়ে দেওয়া হয়।

যেখানে বাচ্চার নিজের কোন ইচ্ছে থাকে না সেখানে বাচ্চাকে জোর করে পড়ানোটা কতটা যুক্তি সঙ্গত?

এইসব বাচ্চা যখন কাজে যায় তখন বিভিন্ন ধরনের কাজ দেওয়া হয়। তবে প্রাথমিক পর্যায়ে হালকা কাজ দিয়ে থাকে। তাপস যখন প্রথম কাজে যায় তখন সে একটা গ্যারেজে কাজ শুরু করে। প্রথম দিকে তাকে দিয়ে বিভিন্ন যন্ত্রপাতি কাজের সময় এগিয়ে দিতে হতো, গ্যারেজে যারা কাজ শিখে গেছে তাদের পাশে বসে বসে কাজ দেখে তা শিখতে হতো। এভাবে পর্যায়ক্রমে দিন দিন তার কাজের মাত্রা বৃদ্ধি পায়।

কিছু কিছু কাজ আছে যা তাদের জন্য ক্ষতিকর, তবে সেখানে সুরক্ষার ব্যবস্থাও থাকে। তাপস যে কাজ করে তাতে তার প্রতি মাসে আয় হয় তিন হাজার থেকে সাড়ে চার হাজার। ওর সমবয়সী যারা অন্য কাজ করে তাদের আয় প্রতি মাসে ছয় হাজার টাকা। কাজের উপর নির্ভর করে যে প্রতি মাসে কতটাকা আয় হবে।

একজন তেরো বছর বয়সের শিশু যদি নিজ ইচ্ছায় পড়াশোনা ছেড়ে দিয়ে কাজ করে তার সংসার চালায় তাহলে দেশ ও জাতির সমস্যা কোথায়?

কেনো শিশু শ্রম অপরাধ হবে? একজন বাচ্চা যখন কাজের জন্য কোন দোকানে যায়, তখন দোকানের মালিক ভয়ে থাকে। আমি যখন তাপসের ছবি তুলতে যায় তখন তাপসের গ্যারেজ মালিক আমাকে ছবি নিতে নিষেধ করেন কারন সে ভয় পাচ্ছিলো সমস্যায় পড়তে হবে বলে।

তাপসের এবং তার গ্যারেজ মালিকের সাথে কিছু কথোপকথন…

প্রশ্নঃ তুমি টাকার হিসাব রাখতে পারো?
তাপসঃ হ্যাঁ পারি।
প্রশ্নঃ মাসে কতটাকা আয় করো তুমি?
তাপসঃ তিন হাজার আবার কোন মাসে বেশি হয়।
প্রশ্নঃ পড়াশোনা করতে ইচ্ছে করে না তোমার?
তাপসঃ না।
প্রশ্নঃ তোমার ছোট ভাই কি করে?
তাপসঃ একজন কাজ করে আরেক জন অনেক ছোট।
প্রশ্নঃ যে ভাই কাজ করে তার বয়স কত হবে?
তাপসঃ নয় বছরের মত।
প্রশ্নঃ তারও কি পড়াশোনা করতে ইচ্ছে করে না?
তাপসঃ হ্যাঁ।
প্রশ্নঃ তোমার বাবা এখন কি করে?
তাপসঃ মাছ মারে?
প্রশ্নঃ নেশা করে নাকি?
তাপসঃ হ্যাঁ নেশাও করে।
প্রশ্নঃ তোমাদের পরিবার এখন ঠিকমত চলে?
তাপসঃ না এখনো সমস্যা আছে।

প্রশ্নঃ আপনার দোকানে এতো কম বয়সি ছেলে কাজ করে আপনার খারাপ লাগে না?
রনিঃ খারাপ লাগে তাই আমি ওকে পড়াশোনা করতে চেয়ে ছিলাম সে করেনি। তাছাড়া আমার দোকানে আর একজন আছে সে এইবার নবম শ্রেণীতে ভর্তি হবে। আমার সেদিকে কোন আপত্তি নেই।
প্রশ্নঃ কত টাকা দেন এদের?
রনিঃ আমার ছোট দোকান তাই এখানে খুব বেশি আয় হয় না। প্রতিদিন একশো থেকে দেড়শো টাকা হিসাব করে রাখি মাস শেষে একসাথে দেই।
প্রশ্নঃ আপনি কি জানেন এই টাকা দিয়ে তারা নেশা করে নাকি?
রনিঃ হ্যাঁ এই বিষয়ে আমি নিশ্চিত যে এই টাকা দিয়ে তারা নেশা করে না।
প্রশ্নঃ কি ধরনের কাজ করায় নেন এদের দিয়ে আপনি?
রনিঃ যে কাজগুলো এরা পারবে সেগুলোই দেই।
প্রশ্নঃ কাজের ফাকে খাবার দেন না?
রনিঃ খাবার তো প্রতিদিন খাওয়ায় সেদিকে কোন অভিযোগ পাবেন না।

শিশু শ্রম আমার কাছে খারাপ একটা বিষয় তবে, যে পরিবারগুলো অর্থের কারনে শেষ হয়ে যাওয়ার পথে তাদের ছেলে মেয়েদের কাজ করতে দেওয়াটা অতি জরুরী। বর্তমানে আমাদের সমাজে শুধু ছেলেরাই বাইরে কাজ করার সুযোগ পায় কিন্তু মেয়েরা এইদিকে পিছিয়ে আছে। কেনো আমরা ছেলেদের পাশাপাশি বিভিন্ন কর্মস্থলে মেয়েদের কাজে লাগাতে পারি না? এই বিষয়ে পরবর্তিতে প্রতিবেদন উপস্থাপন করা হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *